14/08/2023
মা উপন্যাস থেকে- একটু পড়ে দেখুন।
মায়ের মতো পাবে না কাউকে
খুঁজলে সারা বিশ্ব।
মা ছাড়া শূন্য এ পৃথিবী
জগৎ সংসারে তুমি নিঃস্ব।
কার্তিক মাসের সকাল। প্রকৃতিতে সবে শীতের আমেজ আসতে শুরু করেছে। পল্লির মেঠোপথে দূর্বাঘাসের ডগায় ভোরের শিশির মুক্তোর মতো ঝকমক করছে। এমনই এক ঝকঝকে সকালে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে সুহাম। কোনোমতে চোখের ছলছল জল সামলে সামনের দিকে পা বাড়িয়েছে।
পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মা সায়রা বানু। আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন বারবার। ছেলে ঢাকায় চলে যাচ্ছে। আবার কবে ফিরবে জানা নেই। সকালের বিচ্ছুরিত সোনা রোদে চোখের টলমলে পানি বাঁধ মানছে না। হৃদয়ের গভীর তন্ত্রী ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
পা বাড়াতে বাড়াতে সুহাম ভাবল আর পেছনে ফিরে তাকাবে না সে। পেছনে তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মা। এ দৃশ্য সহ্য করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের। তবে প্রতিবারই গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়ার সময় এমনই দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রভাত সূর্যের আলোকোজ্জ্বল রশ্মির দিকে একবার তাকাল সুহাম, ঝলসে এলো চোখ। সেই ঝলসানো চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। বাড়ির সামনের রাস্তায় র্নিবাক চোখে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মা। সাথে আরও দুই-একজন। সুহাম জানে যতক্ষণ দু’চোখে তাকে দেখা যাবে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে মা।
বিদায়ের এ রকম মুহূর্তে দুর্বল হয়ে পড়ে সে। পৃথিবীর সবচেয়ে আবেগ উদ্গিরণকারী দৃশ্যের একটি। সন্তান শিক্ষার জন্য বা ব্যাবসার জন্য বা অন্য কোনো কাজে বাইরে যাচ্ছে আর তার পথের দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মা। এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হয়নি এমন মানুষ জগতে খুব কমই আছে। এমন দৃশ্যে হৃদয়ের গভীর থেকে আবেগ উৎসারিত হয়। জীবনের সমস্ত স্মৃতি উথলে উঠে মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে, বুকের গভীর থেকে উত্থিত হয় মা’কে ছেড়ে প্রাণহীন শহরে চলে যাওয়ার কষ্ট। সাথে যোগ হয় একরাশ অনিশ্চয়তা।
মাকে দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও পথচলায় মনোনিবেশ করল সুহাম। তাকে যে হেঁটে হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই হবে। এসব ছোটখাটো আবেগে উদ্বেলিত হওয়া তার চলবে না। যে যত তাড়াতাড়ি ভালোবাসার গিট্টু ছিঁড়তে পেরেছে সে তত দ্রত উন্নতি করতে পেরেছে। এইসব আবেগী ভালোবাসার জাল ছিঁড়ে মুক্ত আকাশে পাখির মতো উড়তে চায় সে। বাঁধা-বন্ধনহীন উন্মুক্ত। ভালোবাসার জাল ছিন্ন করে একদিন বিস্তীর্ণ পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াবে সে।
প্রত্যন্ত প্রান্তের শান্ত সকালে জীবনের স্ফুলিঙ্গ উড়িয়ে সে চলে আসবে একদিন। জীবন তাকে বরণ করে নেবে সহজাত ভঙ্গিমায়। কিন্তু সেই পর্যন্ত যাওয়া কি তার জন্য সহজ হবে? হোক না সুদৃঢ় প্রস্তরসম কঠিন। তবুও জীবনযুদ্ধে জিততে চায় সে। এই অনুজ্জ্বল পল্লির আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলতে চায় সে। তাই তো মায়া কাটিয়ে সামনের পানে অগ্রসর হতে চায়।
কিন্তু চাইলেই কি সবাই সব পারে? আর সব পারলেও মায়ের স্মৃতি মন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
কার্তিকের আকাশের দিকে মুখ তুলে চাইল সুহাম। মেঘমুক্ত সকালের আকাশ। কোথাও কোনো মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। এই আকাশ নীল হয়ে আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে, যেমন মা আছে তার জীবনে। মা আছে বলেই আজ সে পৃথিবীর প্রান্তরে ঘুরে বেড়াবার সাহস করছে। কথায় আছে প্রত্যেকটা সফল মানুষের পেছনে একজন নারী থাকে। সে নারী হয়তো মা, বোন, প্রেমিকা কিংবা স্ত্রী। কিন্তু সুহামের মনে হয় তার পেছনে আছে মা। এই মা না থাকলে তার পড়ালেখাই হতো না। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। অভাব-অনটনের সংসার। বাবা সংসারের অতটা খোঁজখবর রাখেন না। মা সেই ছোটবেলা থেকে ডিম বেচে, মুরগি বেচে, গরু বেচে তার পড়ালেখার খরচ জোগাড় করে যাচ্ছেন।
মানুষের সফলতার পেছনে যতই অন্য নারীর গল্প থাক সেখানে মায়েদের সংখ্যাই বেশি হবে, ভাবে সুহাম। কেননা স্ত্রীরা তো সফল স্বামী দেখেই বিয়ে করে। আর প্রেমিকারা প্রেমিকের দুর্দিনে কেটে পড়ে। শুধু মা-ই সন্তানদের দুঃসহ দুঃখের দিনে সান্ত¡নার পরশ হয়ে পাশে থাকে। ফ্যাকাশে সময়ের প্রবাহে মোড়া নিস্তরঙ্গ দিনগুলোতে পাশে থেকে, মাথায় হাত বুলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।
কেউ কেউ সেই দুঃখের নিশি পার হয়ে সাফল্যের সোনালি সূর্যের মুখ দেখে। কেউ আবার হারিয়ে যায় শূন্যতায়। সেই জন্য সফল মানুষের পেছনে মায়ের অবদানই বেশি হয়ে থাকে। নিতান্ত দুঃসময়েও মা কোনোদিন সন্তানকে ফেলে যায় না। বোবা, কালা, প্রতিবন্ধী সন্তানকেও সারা পৃথিবীর মানুষ অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলেও তার পেছনে চরম ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে লেগে থাকে মা। সবাই ফেলে চলে গেলেও মা যেতে পারে না। এখানেই মা অনন্য, শাশ্বত, যুগোপযোগী এক সত্তা। দুনিয়ার কেউ তোমাকে বিশ্বাস না করলেও বিনা বাক্যব্যয়ে মা বিশ্বাস করবে। সন্তানের প্রতি এমনই চরম আস্থা প্রতিটা মায়ের।
চলবে