16/04/2026
পবিত্র কুরআনের নাযিল হওয়া তৃতীয় সূরা ছিলো 'সূরা মুজাম্মিল'।
এই সূরায় আল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন কিয়ামুল লাইল তথা রাতের নামাজের জন্য।
প্রথমদিকে কিয়ামুল লাইল ফরজ ছিলো। আমরা যেমন ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ পড়ি, সাহাবীদের সময় শুরুতে রাতের নামাজ ছিলো ফরজ।
আয়াতের শেষাংশ বেশ ইন্টারেস্টিং।
আল্লাহ ৩ শ্রেণির মানুষকে ছাড় দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন, আল্লাহ জানেন তোমরা এটা পারবে না, এজন্য যতোটা পড়া সহজ হয়, ততোটা পড়ো।
সেই ৩ শ্রেণী হলো:
১. যারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করছে
২. যারা অসুস্থ
৩. যারা ব্যবসা করছেন।
ওয়েইট এ মিনিট...।
যারা অসুস্থ, তাদের জন্য আল্লাহ ছাড় দিয়েছেন বুঝলাম। যারা যুদ্ধের ময়দানে, তারা ভয়-আতঙ্কে আছে কখন শত্রুবাহিনী আক্রমণ করবে, তাদের জন্যও না হয় রাতের নামাজে ছাড় আছে।
কিন্তু, যারা ব্যবসা করছে?
ব্যবসা তো দুনিয়াবি কাজ। আর রাতের নামাজ পড়া ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রথমদিকে যা ফরজ ছিলো।
অসুস্থতার জন্য না হয় ছাড় দেয়া হলো।
আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করা এটাও তো একটা ইবাদত।
কিন্তু, ব্যবসা করার জন্যও আল্লাহ ছাড় দিচ্ছেন, যেটা কিনা আমাদের কাছে 'দুনিয়াবি' কাজ?
তারমানে, আল্লাহ এই আয়াতে ব্যবসাকে আমরা যেমন স্রেফ 'দুনিয়াবি কাজ' হিশেবে দেখি, সেভাবে না দেখতে বলেছেন?
পবিত্র কুরআনের সূরা মুজাম্মিলের সর্বশেষ (২০ নাম্বার) আয়াত আমাদেরকে একটু নড়েচড়ে বসতে বলে।
আমরা যারা দ্বীন-দুনিয়ার বাইনারি করি, যেভাবে আমাদের রুটিনকে সেক্যুলারাইজড করি, এই আয়াত আমাদের চিন্তা রিথিংক করতে বলে।
সাহাবীদের মধ্যে আলেম সাহাবী ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু; হানাফী ফিক্বহে যেসব সাহাবীর ইমপ্যাক্ট সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন অন্যতম।
ইমাম বাগাভী তার তাফসিরে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি উক্তি উল্লেখ করেন-
“কোনো ব্যক্তি যদি ধৈর্য ও সওয়াবের নিয়তে মুসলমানদের কোনো শহরে পণ্য নিয়ে আসে
এবং সেদিনের বাজারমূল্যে তা বিক্রি করে,
তাহলে আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা হয় শহীদদের সমান।”
এরপর তিনি সূরা মুজাম্মিলের ২০ নাম্বার আয়াত তেলাওয়াত করেন।
অর্থাৎ, এই আয়াতে আল্লাহ ব্যবসায়ীদের এমন মর্যাদা দেন, যেন তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে লিপ্তদের মতো।
তারা ব্যবসা করছে, সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত। সকালবেলা আবার ব্যবসা করবে, একাউন্ট সামলাবে, কাস্টমার সার্ভিস নিয়ে চিন্তা করবে, মার্কেটিং ক্যাম্পেইন নিয়ে কাজ করবে। সবকিছুই তারা হালালভাবে করবে, মানুষের সেবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি চাইবে। এই কাজকে আল্লাহ তুলনা করেন আল্লাহর রাস্তায় যারা যুদ্ধ করছে, তাদের সাথে!
ব্যবসায়ীদের কাজ যেনতেন কাজ না। ইসলামের প্রথমদিকের ফরজ বিধান রাতের নামাজ, সেই নামাজ থেকে ব্যবসায়ীদের ছাড় দেয়া হয়— কারণ তারা ইতোমধ্যে একটি ভালো কাজে, ইতোমধ্যে একটি ইবাদতে লিপ্ত!
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় খতিব আশ-শারবীনী বলেন- "আল্লাহ এই আয়াতে মুজাহিদদের মর্যাদা এবং ব্যবসায়ীদের মর্যাদাকে সমান করেছেন।
কারণ উপার্জনকারী ব্যক্তি নিজের, পরিবারের এবং অন্যদের ওপর সদয় হওয়ার জন্য যা খরচ করে,
তা অত্যন্ত মহৎ একটি কাজ। সুতরাং এই আয়াত প্রমাণ করে যে হালাল রোজগারের জন্য পরিশ্রম করা- এটিও জিহাদের মতো এক মর্যাদাপূর্ণ কাজ,
কারণ আল্লাহ এটিকে জিহাদের সঙ্গে একই স্থানে উল্লেখ করেছেন।” (লুবাবুত তাওয়ীল, আল-খাজিন: ৪/৩৪৯)
এই আয়াতটি ভালোভাবে বুঝেছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু।
এজন্য তিনি বলতেন— মারা যাবার জন্য তার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হলো যুদ্ধের ময়দান। এরপর হলো ব্যবসা করাবস্থায়। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ২১০১৮)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- কিয়ামতের দিন সৎ, আমানতদার ব্যবসায়ীরা থাকবেন নবী, সিদ্দিক, শহীদদের সাথে। (জামে আত-তিরমিজি: ১২০৯)
আবারও ব্যবসায়ীদের তুলনা শহীদদের সাথে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীস যেন সূরা মুজাম্মিলের ২০ নাম্বার আয়াতের ব্যাখ্যা! যেন তিনি আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন— ব্যবসা করছো মানে স্রেফ দুনিয়াবি কাজ না। ব্যবসা যদি হালালভাবে হয়, তাহলে তোমার এই ব্যবসা আল্লাহর রাস্তায় সময় দেয়ার মতোই!
© আরিফুল ইসলাম