12/12/2025
কেবল দুইজন বীরশ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধার ফটোগ্রাফ পাওয়া যায়, তাদের একজন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
সহযোদ্ধারা বারবার বলতেন, আপনি অসতর্ক যুদ্ধ করেন, বেপরোয়া যুদ্ধ করেন। আত্মরক্ষার কথা ভাবেন না। সহযোদ্ধারা বলতেন, উনি যেনো মরিয়া হয়ে ছিলেন শহিদ হবার জন্য।
শহিদি মৃত্যু তাঁর হাতে ধরা দিয়েছিল ১৪ই ডিসেম্বর সকাল নয়টায়।
যুদ্ধরত অবস্থায় মহানন্দা নদীর তীরে শত্রুর গুলিতে লুটিয়ে পড়েন অসম্ভব সুদর্শন এই লোকটি। মাত্র ৪৮ ঘন্টার জন্য দেখতে পারলেন না বিজয়।
---
সত্যিই বলতেসি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মাত্র দুজন বীরশ্রেষ্ঠর খুব স্পষ্ট, স্টুডিওতে তোলা বা ফরমাল ফটোগ্রাফ সচরাচর চোখে পড়ে। তাঁদের একজন ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, আর অন্যজন —ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
ছবিতে শান্ত, সৌম্য আর মায়াবী যে চোখ দুটো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, কে জানত সেই চোখের মালিকের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর বারুদ?
বরিশালের বাবুগঞ্জের সন্তান মহিউদ্দিন তখন পাকিস্তানে কর্মরত। চোখের সামনে মাতৃভূমির ওপর নিপীড়ন মেনে নিতে পারেননি। তাই জুলাই মাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে শিয়ালকোট সীমান্ত হয়ে পালিয়ে এসেছিলেন রণাঙ্গনে। যোগ দিয়েছিলেন ৭ নম্বর সেক্টরে, দায়িত্ব নিয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমা মুক্ত করার।
কিন্তু রণাঙ্গনে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছিলেন এক বিস্ময়ের নাম। তার সহযোদ্ধা এবং অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই শঙ্কিত হয়ে পড়তেন। কারণ, তাদের কমান্ডার যুদ্ধ করতেন সব নিয়ম উপেক্ষা করে, একেবারে সামনে থেকে।
যুদ্ধের সাধারণ নিয়ম হলো— নিজে সেফ জোনে থেকে কভার ফায়ার দেওয়া বা কমান্ড করা। কিন্তু মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছিলেন মৃত্যুঞ্জয়ী। সহযোদ্ধারা তাকে বারবার অনুরোধ করতেন, "স্যার, আপনি মাথা নিচু করুন, আপনি আরেকটু সাবধানে থাকুন। আপনি মারা গেলে আমাদের কী হবে?"
উত্তরে তিনি কেবল হাসতেন। তাঁর কমরেডরা লিখে গেছেন- কখনো কখনো মনে হতো, তিনি যেন কোনো এক অলৌকিক টানে বা আধ্যাত্মিক নেশায় শহিদি মৃত্যুকে খুঁজে ফিরছেন।
তার ক্ষিপ্রতা আর বেপরোয়া সাহস দেখে মনে হতো, হয় বিজয়, নয়তো মৃত্যু—তৃতীয় কোনো পথ তার জানা নেই।
দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। বিজয়ের সূর্য তখন আক্ষরিক অর্থে পূর্বাকাশে উঁকি দিচ্ছে। চারদিকে পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর মুক্ত করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করলেন তিনি। সিদ্ধান্ত নিলেন, মহানন্দা নদী অতিক্রম করে শত্রুর ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানবেন।
ভোরবেলা। কুয়াশায় মোড়ানো মহানন্দার তীর।
সহযোদ্ধাদের নিয়ে নদী পার হয়ে তিনি অবস্থান নিলেন রেহাইচর এলাকায়। তীব্র গুলিবর্ষণ চলছে। যথারীতি সবার আগে, সবার সামনে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর। এক হাতে এসএমজি, অন্য হাতে গ্রেনেড। বাঙ্কারের পর বাঙ্কার দখল করে এগিয়ে যাচ্ছেন। পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।
ঘড়িতে তখন সকাল ৯টা।
বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি যখন শেষ আঘাতটি হানার জন্য মাথা তুললেন, ঠিক তখনই শত্রু পক্ষের একটি স্নাইপার বুলেট বা মেশিনগানের গুলি সরাসরি বিদ্ধ করল তার কপালে। যে চোখ দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই চোখের নিচেই আঘাত হানল ঘাতক বুলেট। মহানন্দার পাড়ে লুটিয়ে পড়লেন বাংলার সূর্যসন্তান।
রক্তে লাল হয়ে গেল মহানন্দার পানি। অথচ তিনি জানলেন না, আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পর তার প্রিয় জন্মভূমি বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। তিনি জানলেন না, তার রক্তে কেনা স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।
১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ল। কিন্তু সেই পতাকা দেখার জন্য ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর আর বেঁচে রইলেন না। ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো।
আজও সেখানে গেলে মনে হয়, এই অকুতোভয় বীর হয়তো আক্ষেপ করছেন—"ইশ, আর একটু যদি সময় পেতাম! বিজয়ের উল্লাসটা যদি একবার দেখে যেতে পারতাম!"
এই মায়াবী ছবিটার দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। এত সুন্দর একটা জীবন, এত বড় একটা আত্মত্যাগ— সবই ছিল আমাদের এই পতাকার জন্য।
--- কালেক্টেড