15/01/2026
ক্রিকেটের সঙ্গে দেশপ্রেমের যে সম্পর্ক আমাদের সামনে দাঁড় করানো হয়, তা আসলে এক সুপরিকল্পিত মিথ্যা বয়ান। এই বয়ানটি এমনভাবে আমাদের চিন্তার ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আমরা আর প্রশ্ন করতেই শিখিনি। কেউ ব্যথা নিয়েও খেলছে, ইনজেকশন নিয়ে মাঠে নামছে, দাঁত চেপে উইকেট বাঁচাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আবেগে ভেসে বলি, এই তো প্রকৃত দেশপ্রেম। কিন্তু এক মুহূর্ত থেমে যদি হিসাব করি, দেখি সেই খেলোয়াড়ের মাসিক আয়, বোনাস, বিজ্ঞাপন, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা মিলিয়ে তিনি দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও সুবিধাভোগী মানুষের একজন। তাঁর ঝুঁকি আছে, কিন্তু সেই ঝুঁকির প্রতিদানও বিপুল।
এদিকে সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক সৈনিকের গল্প কখনোই আলোচনার কেন্দ্রে আসে না। যিনি মাসের পর মাস পরিবার ছেড়ে অজানা ভয় আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাস করেন, যাঁর বেতন অনেক সময় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজার খরচের সমানও নয়। তাঁর হাতে কোনো ব্যাট নেই, গায়ে কোনো স্পনসর লোগো নেই, টিভি ক্যামেরাও নেই। তাঁর ভুল হলে খবর হয় না, কিন্তু মারা গেলে শুধু একটি নাম্বার যোগ হয় পরিসংখ্যানে। এই বৈপরীত্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা কাকে বীর বানাচ্ছি আর কাকে ভুলে যাচ্ছি।
আসলে কল্পিত বীরদের দিয়ে আমরা নিজেদের আবেগ মেটাই, কারণ বাস্তব বীরদের দিকে তাকালে আমাদের দায়বদ্ধতা বেড়ে যায়। একজন সৈনিকের দিকে তাকানো মানে প্রশ্ন করা, রাষ্ট্র তাকে কী দিচ্ছে। একজন কৃষকের দিকে তাকানো মানে জানতে চাওয়া, তার ঘামে ফলানো ফসলের ন্যায্য দাম সে পাচ্ছে কি না। একজন শ্রমিকের দিকে তাকানো মানে স্বীকার করা, দেশের অর্থনীতি তার ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, তাই আমরা সেগুলো এড়িয়ে যাই।
বিশ্বের বহু দেশে খেলাধুলা পরিচয়ের একটি অংশ মাত্র। সেখানে খেলায় হারলেও রাষ্ট্র টিকে থাকে, সমাজ ভেঙে পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে ক্রিকেট ধীরে ধীরে এক ধরনের অভ্যাসগত হিপনোটিজমে পরিণত হয়েছে। মানুষ নিজের হতাশা ঢাকে একটি জয় দিয়ে, নিজের ব্যর্থতা ভুলে থাকে একটি ছয়ের শব্দে, সামাজিক অস্থিরতা চাপা দেয় টেলিভিশনের চিৎকারে। যেন মাঠে জয় এলেই সব ক্ষত সেরে যাবে, সব প্রশ্ন মুছে যাবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশপ্রেম কোনো স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। দেশপ্রেম হলো সেই মানুষের নিঃশব্দ দায়িত্ববোধ, যে আলোচনার বাইরে থেকেও নিজের কাজ করে যায়। দেশপ্রেম হলো নামহীন ঘাম, অদৃশ্য ত্যাগ, আর প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত। ক্রিকেট ভালোবাসা হতে পারে, বিনোদন হতে পারে, গর্বের উপলক্ষও হতে পারে। কিন্তু তাকে দেশপ্রেমের একমাত্র মাপকাঠি বানানো মানে আমরা নিজেরাই নিজেদের চোখে ধুলো দিচ্ছি।