02/22/2026
ইথিওপিয়ার কফি বন থেকে শুরু হওয়া এক নিঃশব্দ গল্প আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পানীয় শিল্পগুলোর একটিতে রূপ নিয়েছে। প্রায় এক হাজার বছর আগে ইথিওপিয়ার কফা অঞ্চলে এক রাখাল লক্ষ্য করেছিল তার ছাগলগুলো একধরনের লাল ফল খাওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে। সেই ফলই পরে কফি নামে পরিচিত হয়। ইতিহাসবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন, নবম শতাব্দীর দিকেই ইথিওপিয়ায় কফির প্রাথমিক ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে তখন এটি ছিল স্থানীয় ও সীমিত পরিসরের এক পানীয়, কোনো বৈশ্বিক পণ্য নয়।
পরিসংখ্যান বলছে, আজ যে কফি আমরা পান করি তার জেনেটিক উৎসের প্রায় ৯৫ শতাংশই ইথিওপিয়ার বুনো আরাবিকা গাছের সঙ্গে সম্পর্কিত। অথচ এই ইথিওপিয়া কখনোই কফি বাণিজ্যের প্রথম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ কফিকে বিশ্বের মানচিত্রে তুলে ধরার কাজটি হয়েছিল আরব ভূখণ্ডে, বিশেষ করে ইয়েমেনে। পনেরো শতকের দিকে ইয়েমেনের সুফি দরবেশরা দীর্ঘ রাতের ইবাদতে জাগ্রত থাকার জন্য কফি পান শুরু করে। ধীরে ধীরে মক্কা, মদিনা ও কায়রোতে কফি ছড়িয়ে পড়ে। ষোড়শ শতকের শুরুতে ইয়েমেনের মোখা বন্দর হয়ে কফি প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ নেয়।
১৫৫০ থেকে ১৬৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ কফি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করত আরব ব্যবসায়ীরা। ইয়েমেন তখন কার্যত কফির একচেটিয়া সাম্রাজ্য। মোখা বন্দরের মাধ্যমে বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ হাজার টন কফি ইউরোপ ও এশিয়ায় পাঠানো হতো, যা সে সময়ের জন্য ছিল বিশাল অঙ্ক। এই আধিপত্য ধরে রাখতে আরব শাসকেরা একটি কৌশল নেয়। তারা নিয়ম করে দেয়, রপ্তানির আগে কফির বীজ সেদ্ধ বা ভেজে দিতে হবে, যাতে অন্য কোনো দেশে কফি গাছ জন্মাতে না পারে। ইতিহাসে এটিই সম্ভবত প্রথম পরিকল্পিত বায়োলজিক্যাল ট্রেড কন্ট্রোল।
কিন্তু ইতিহাস কখনোই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে ভারতের কর্ণাটকের এক সুফি সাধক, বাবা বুদান, হজ পালন করতে গিয়ে ইয়েমেনে যান। সেখানে কফির স্বাদ ও প্রভাব তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। লোককথা অনুযায়ী, তিনি বুঝতে পারেন এই পানীয় শুধু আধ্যাত্মিক নয়, অর্থনৈতিক শক্তির উৎসও হতে পারে। ফিরে আসার সময় তিনি সাহসী এক কাজ করেন। নিজের পোশাকের ভাঁজে বা কোমরবন্ধে লুকিয়ে সাতটি কফি বীজ নিয়ে যান। মাত্র সাতটি বীজ, কিন্তু সেই সময়ের আরব আইনের চোখে এটি ছিল ভয়ংকর অপরাধ। কারণ কফি বীজ পাচার মানে ছিল আরবদের শত বছরের একচেটিয়া ব্যবসার ওপর আঘাত।
এই সাতটি বীজ থেকেই ভারতের চিকমাগালুর অঞ্চলে প্রথম কফি চাষ শুরু হয়। আজও সেখানে বাবা বুদানের নামে পাহাড় ও মাজার রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ভারত বছরে প্রায় ৩.৫ লাখ টন কফি উৎপাদন করে, যার প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি হয়। এই উৎপাদনের ঐতিহাসিক শিকড় ওই সাতটি বীজেই গিয়ে ঠেকে। এখান থেকেই কফির নিয়তি বদলাতে শুরু করে।
ইউরোপ তখন শিল্প ও বাণিজ্যের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। ১৬১৫ সালে প্রথমবার ভেনিসে কফি আসে। এরপর ডাচ, ফরাসি ও ব্রিটিশরা কফির সম্ভাবনা বুঝে ফেলে। ১৬৯০ সালে ডাচরা সফলভাবে ইয়েমেন থেকে কফি গাছ চুরি করে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে চাষ শুরু করে। মাত্র ২০ বছরের মধ্যে জাভা ইউরোপের কফি চাহিদার বড় অংশ জোগান দিতে থাকে।
ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে বিশ্বের বড় কফি রপ্তানিকারীদের মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালের প্রথম দিকে দেশটি প্রায় ২ লাখ টন কফি রপ্তানি করেছে, যার বড় অংশই যায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে। এর মধ্যে Robusta বীন রপ্তানি সবচেয়ে বেশি, আর Arabica কম হলেও মানসম্মত। কিছু বিশেষ কফি, যেমন Kopi Luwak, সীমিত পরিমাণে রপ্তানি হয়, দামও অন্য কফির তুলনায় অনেক বেশি। মোটামুটি বলতে গেলে, ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানির প্রায় ৭০% Robusta এবং ৩০% Arabica।
১৭১৫ সালে ফ্রান্স আমস্টারডাম থেকে একটি কফি গাছ পায়, যা প্যারিসের রাজকীয় বাগানে রোপণ করা হয়। সেই গাছ থেকেই পরে ক্যারিবিয়ান ও ল্যাটিন আমেরিকায় কফির বিস্তার ঘটে।
একটি চমকপ্রদ পরিসংখ্যান হলো, আজকের বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ কফি উৎপাদিত হয় ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়। অথচ এই অঞ্চলগুলোর কোনোটিই কফির জন্মভূমি নয়। ব্রাজিলে কফি পৌঁছায় ১৭২৭ সালে, এক কূটনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। বর্তমানে ব্রাজিল একাই বিশ্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ কফি উৎপাদন করে, বছরে গড়ে ৬০ মিলিয়ন ব্যাগের বেশি। এর বাজারমূল্য শত শত বিলিয়ন ডলার।
বর্তমান বৈশ্বিক কফি ইন্ডাস্ট্রির আর্থিক পরিসংখ্যান আরও বিস্ময়কর। আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন কেজির বেশি কফি খাওয়া হয়। কফি শিল্পের মোট বাজারমূল্য ৪৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, এবং সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১২৫ মিলিয়ন মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে অধিকাংশই ছোট কৃষক, যাদের গড় জমির পরিমাণ দুই হেক্টরেরও কম।
এই বিশাল শিল্পের কেন্দ্রে এখনো আছে সেই পুরোনো গল্পের ছায়া। কফি আজ আর শুধু পানীয় নয়, এটি সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির অংশ। ইউরোপের কফিহাউসগুলো একসময় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র ছিল। লন্ডনে ১৭০০ সালের দিকে প্রায় ৩ হাজার কফিহাউস ছিল, যেখানে ব্যবসা, সাহিত্য ও বিপ্লবী চিন্তার জন্ম হতো। ফ্রান্সের বিপ্লবের আগেও প্যারিসের কফিশপগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
কিন্তু এই সমৃদ্ধির আড়ালে আছে তিক্ত বাস্তবতাও। বিশ্ববাজারে এক কাপ কফির দাম যেখানে ৪ থেকে ৫ ডলার, সেখানে কফি চাষি পান তার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কফি উৎপাদক দেশগুলোর প্রায় ৪৪ শতাংশ চাষি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে আরাবিকা কফি চাষযোগ্য জমির প্রায় ৫০ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে গবেষণা সতর্ক করছে।
তবুও কফির গল্প থেমে নেই। নতুন জাত, টেকসই চাষ, ফেয়ার ট্রেড এবং স্পেশালটি কফির বাজার বাড়ছে দ্রুত। শুধু স্পেশালটি কফির বাজারই বছরে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম কফিকে আবার নতুনভাবে আবিষ্কার করছে, ঠিক যেমন একসময় বাবা বুদান করেছিলেন নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে।
একটি বৈশ্বিক শিল্পের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল মাত্র সাতটি বীজের চোরাচালানের ওপর। যদি সেই রাতে বাবা বুদান সাহস না করতেন, যদি ইয়েমেনের পাহারাদার আরও কড়া হতো, তাহলে আজকের কফির মানচিত্র হয়তো পুরোপুরি ভিন্ন হতো। ইতিহাসের এই ক্ষুদ্র অথচ সাহসী মুহূর্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কখনো কখনো সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে সবচেয়ে ছোট সিদ্ধান্ত থেকে। কফির প্রতিটি কাপে তাই শুধু স্বাদ নয়, লুকিয়ে আছে বিদ্রোহ, বুদ্ধি আর মানুষের অদম্য কৌতূহলের গল্প।