29/07/2026
স্থা-কল্প অফিস: প্রান্তিক শহরে দৃশ্যমান এক স্থাপত্যচর্চার গল্প..
প্রতিদিনের মতো সামু ভাইয়ের চায়ের দোকানে আড্ডা চলছে। কেউ রাজনীতি নিয়ে কথা বলছে, কেউ ক্রিকেট, কেউ বাজারদর। নিচতলায় সারি সারি দোকান, ওপরের তলায় বিভিন্ন অফিস, আর ঠিক পাশেই এক ঐতিহাসিক মাঠ; প্রতিদিন খেলাধুলা, উৎসব, আড্ডা আর মানুষের পদচারণায় নাগরিক জীবন স্পন্দিত হয় এখানে। চায়ের দোকানের পাশ দিয়েই উপরে ওঠার সিঁড়ি। নিচের কোলাহল পেরিয়ে ওপরে উঠতেই উন্মোচিত হয় স্থা-কল্পের ছোট্ট কর্মপরিসর-- সমসাময়িক স্থাপত্যচর্চার দৃশ্যমান একটি ঠিকানা।
দৃশ্যপটটি দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী জনপদ কুষ্টিয়াতে, শহরের প্রধান সড়ক এন. এস. রোডসংলগ্ন একটি বেসরকারি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বাণিজ্যিক এলাকায়। দেশের বড় নগরগুলোর বাইরে এমন জনপদে স্থাপত্যচর্চা এখনও খুব পরিচিত বিষয় হয়ে ওঠেনি। তাই স্থা-কল্পের কাছে স্থাপত্যের সূচনা কোনো ভবন নির্মাণ দিয়ে নয়; বরং মানুষের প্রয়োজনে একটি স্থানের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে।
ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশনের সামনে থেকে ঐতিহাসিক মাঠে ঢোকার মুখেই চারতলার ভবনের দোতলার অংশটুকু আলাদা করে চোখে পড়ে, এলোমেলো নগরবাস্তবতার ভেতরে যেন একটুকরো সংযত স্থাপত্য। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই বিম পর্যন্ত খোলা দুই পাশ দিয়ে একসঙ্গে উন্মোচিত হয় এই কর্মপরিসর। একদিকে স্থা-কল্পের অফিস, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ বিবেচনায় একই নকশার ধারাবাহিকতায় সমপরিমাণ আরেকটি পরিসর। পূর্ব ও পশ্চিমের ইটের জালি দিয়ে ছেঁকে আসা আলো ও বাতাস এই সিঁড়িঘর ও কর্মপরিসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। অফিসে আসা অতিথি, মার্কেটের দর্শনার্থী কিংবা চায়ের দোকানের আড্ডায় আসা মানুষ; সবাই অনায়াসেই এই চর্চাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান । স্থা-কল্প এখানে নিজেকে কোনো বিচ্ছিন্ন পেশাগত পরিসর হিসেবে গড়ে তোলেনি; বরং নগরজীবন ও স্থাপত্যের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছে।
মাত্র ৯৫৩ বর্গফুট জায়গার মধ্যে দেয়াল, দরজা-জানালা, পার্টিশন ও আসবাবগুলোকে একসঙ্গে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে নকশা করা হয়েছে। অফিসের ভেতরে নেই প্রচলিত অর্থে কোনো আলাদা কক্ষ। স্থপতি, সহকর্মী, ক্লায়েন্ট, কারিগর কিংবা অতিথী—সবার জন্যই এখানে সমান অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। একটি ধারাবাহিক উন্মুক্ত কর্মপরিসরে সবাই বসে কাজ করেন, আলোচনা করেন, মত বিনিময় করেন এবং একে অপরের কাছ থেকে শেখেন। পূর্বদিকে মাঠমুখী মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উচ্চতার জানালা দিয়ে সারাদিন প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস এখানে প্রবেশ করে। মাঠ থেকেও অফিসের কর্মপরিসরটা স্পষ্ট দেখা যায়। কম্পিউটারের পর্দা থেকে চোখ তুলে তাকালেই সবুজ মাঠ আর শহরের উন্মুক্ত দিগন্ত চোখকে স্বস্তি দেয়।
প্রতিদিনই এখানে অদৃশ্য কিছু পরিবর্তনের সূচনা হয়। ক্লায়েন্টরা নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি স্থাপত্যে আলো, বাতাস ও পরিবেশগত গুণমানের গুরুত্বও উপলব্ধি করতে শেখেন। স্থানীয় কারিগরেরা নির্দেশনা নির্ভর না হয়ে, একসঙ্গে কাজ করতে করতেই উন্নত নির্মাণের সূক্ষ্মতা রপ্ত করেন। তরুণ স্থপতিরাও বুঝতে শুরু করেন, অর্থবহ স্থাপত্যচর্চার জন্য নিজের অঞ্চল ছেড়ে যাওয়া সবসময় প্রয়োজন হয় না। আর এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলোই ধীরে ধীরে একটি শহরের স্থাপত্য-সংস্কৃতিকে নতুন রূপ দিতে শুরু করে।
এই প্রকল্পের প্রতিটি নির্মাণকাজ স্থানীয় কারিগরদের হাতে সম্পন্ন হয়েছে। উন্মুক্ত ইটের গাঁথুনি, স্কিম-কোট করা কনক্রিট, রেইলিং ও পাল্লায় ব্যবহৃত মাইল্ড স্টিল, আর স্থানীয় শিশুকাঠ ও পুনর্ব্যবহৃত প্লাইউডের সমন্বয়ে তৈরি আসবাবপত্র-- সবকিছুতেই রয়েছে সংযম ও উপকরণের প্রতি সততা। ভাসমান টেবিলের পাটাতন, মোলায়েম গোলাকার প্রান্ত, আলো-ছায়ায় জীবন্ত হয়ে ওঠা খাঁজগুলো শুধু নকশার সৌন্দর্য্য বাড়ায়নি; বরং কাজের স্বাচ্ছন্দ্য, উপকরণের স্থায়িত্ব, ব্যবহারের বহুমুখিতা ও স্থানিক ধারাবাহিকতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
স্থা-কল্প অফিস আকারে ছোট, অবস্থানে সাধারণ; কিন্তু এর স্বপ্ন অনেক বড়। এটি একটি সাধারণ বাণিজ্যিক ভবনে এমন এক অংশগ্রহণমূলক পরিসর তৈরি করেছে, যেখানে স্থাপত্যকে কাছ থেকে অনুভব করা যায়। এই প্রকল্প মনে করিয়ে দেয়, স্থাপত্যের প্রকৃত শক্তি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভে নয়; বরং এমন বিনম্র পরিসরেই, যেখানে স্থাপত্য মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়, সহজলভ্য হয়, প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে মিশে যায় এবং ধীরে ধীরে একটি শহরের স্থাপত্য-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
_
মোঃ নাজমুস সাকিব (তনু)
প্রধান স্থপতি, স্থা-কল্প আর্কিটেক্টস
২১ জুলাই, ২০২৬
-
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জোবায়ের, মাহিন, প্রিয়ন্তী, নাঈম