26/06/2026
জাহাঙ্গীর স্যারের ওয়াল থেকে.....
সম্প্রতি ২৪ জুন, ২০২৬ তারিখে ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে একটি ভয়াবহ এবং বিরল "ডাবলেট আর্থকোয়েক" (Doublet Earthquake) বা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা এই জোড়া ভূমিকম্পে দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটেছে।
প্রকৌশলগত ও ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুর্যোগের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:
⭕ ভূমিকম্পের স্থান ও ভূতাত্ত্বিক কারণ (Epicenter & Tectonics)
✦ কোথায় ঘটেছে: ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভেনেজুয়েলার উত্তর-কেন্দ্রীয় উপকূলে, কারাবোবো (Carabobo) রাজ্যের মোরন (Morón) এবং ইয়ারাকুই (Yaracuy) অঞ্চলের কাছাকাছি।
✦ কেন ঘটেছে: ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলটি মূলত ক্যারিবিয়ান প্লেট (Caribbean Plate) এবং দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের (South American Plate) সক্রিয় সীমানায় বা ফল্টে অবস্থিত। এখানে থাকা প্রধান ফল্ট সিস্টেম, বিশেষ করে সান সেবাস্তিয়ান ফল্ট (San Sebastián Fault)—যা বোকোনো-এল পিলারের অংশ—সেখানে ডান-পার্শ্বিক স্ট্রাইক-স্লিপ (Right-lateral strike-slip) স্থানচ্যুতির কারণে এই ভূকম্পন সৃষ্টি হয়। ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলে ক্যারিবিয়ান প্লেট এবং দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের যে সংযোগস্থল, সেখানে মূলত একটি বিশাল এবং দীর্ঘ ফল্ট সিস্টেমের চেইন বা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এই পুরো নেটওয়ার্কটিকে সামগ্রিকভাবে ভেনেজুয়েলার প্রধান সিসমিক জোন বলা হয়, যার দুটি প্রধান অংশ হলো বোকোনো ফল্ট (Boconó Fault) এবং এল পিলার ফল্ট (El Pilar Fault)।
⭕ পরপর দুটি বড় ভূমিকম্পের কারণ (Why Back-to-Back Doublet?)
ভূবিজ্ঞানের ভাষায় একে সেসমিক ডাবলেট (Seismic Doublet) বলা হয়। প্রথম ধাক্কাটি ছিল Mw-7.2 মাত্রার একটি ফোরশক (Foreshock), যা ভূপৃষ্ঠের প্রায় ২২ কিমি গভীরে উৎপন্ন হয়। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর একই ফল্ট লাইনের ভিন্ন স্থানে আরও অগভীর (মাত্র ১০ কিমি গভীরে) এবং শক্তিশালী Mw-7.5 মাত্রার মেইনশক (Mainshock) আঘাত হানে।
কাঠামোগত বিপর্যয়: প্রথম ভূকম্পনে ভবনগুলোর শক্তি ও রিজিডিটি (Stiffness) অনেকাংশে হ্রাস পায়। সেই ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর দ্বিতীয় তীব্র ঝাঁকুনি আসায় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত কাঠামো সিসমিক লোড নিতে পারেনি, ফলে মুহূর্তের মধ্যেই একের পর এক বহুতল ভবন ধসে পড়ে।
⭕ অবকাঠামো ধসে পড়ার কারণ ও বিল্ডিং কোড (Building Code & Structural Failure)
✦ বিল্ডিং কোড ছিল কি না: ভেনেজুয়েলার নিজস্ব সিসমিক বিল্ডিং কোড রয়েছে, যা COVENIN 1756 নামে পরিচিত (সর্বশেষ সংস্করণ COVENIN 1756-2019)। দেশটির কোড - ডিজাইন স্পেকট্রাম ও ডাকটিলিটি ফ্যাক্টরের দিক থেকে বেশ উন্নত।
✦ কোড মানা হয়েছিল কি না: একসময় ভেনেজুয়েলার এই কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ করার আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা ছিল। তবে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের কারণে কোড এনফোর্সমেন্ট (Code enforcement) এবং নির্মাণ তদারকি প্রায় ভেঙে পড়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, অপরিকল্পিত নকশা এবং পুরোনো ভবনগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ছিল স্পষ্ট।
⭕ সয়েল কন্ডিশন, লিকুইফেকশন ও টিল্টেড বিল্ডিং (Soil & Foundation Performance)
কারাকাস এবং উপকূলীয় লা গুয়াইরা (La Guaira) অঞ্চলের কিছু অংশ নরম পলিমাটি এবং সেডিমেন্টারি সয়েল (Soft sedimentary deposits) দ্বারা গঠিত।
✦ সাইট অ্যাম্প্লিফিকেশন ও লিকুইফেকশন: অগভীর উৎপত্তিস্থল হওয়ায় ভূকম্পনের তরঙ্গের তীব্রতা নরম মাটিতে এসে বহুগুণ বেড়ে যায় (Site amplification)। উপকূলীয় এবং জলাশয়ের কাছাকাছি নিচু এলাকাগুলোতে লিকুইফেকশন (Liquefaction) বা মাটির তারল্য অবস্থার লক্ষণ দেখা গেছে, যার ফলে মাটির বিয়ারিং ক্যাপাসিটি হঠাৎ শূন্যে নেমে আসে।
✦ টিল্টেড বিল্ডিং: লিকুইফেকশন এবং ডিফারেনশিয়াল সেটেলমেন্টের কারণে বেশ কিছু বহুতল ভবন হেলে পড়েছে (Tilted buildings), এবং কারাকাসের আলতামিরা (Altamira) এলাকায় একটি ২২ তলা ভবনসহ বেশ কয়েকটি বহুতল কাঠামো সম্পূর্ণ কলাপ্স করেছে।
⭕ আনুমানিক হতাহতের সংখ্যা (Estimated Casualties)
প্রাথমিক সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর (যেমন IFRC ও ReliefWeb) তথ্য অনুযায়ী:
✦ নিহত: এ পর্যন্ত অন্তত ১৮৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে এটা বেড়ে ৫০,০০০ ছাড়াতে পারে।
✦ আহত: ১,৫২০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন, এটাও অনেক বেশি হওয়ার কথা।
✦ নিখোঁজ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়াদের উদ্ধারে এখনো তল্লাশি অভিযান চলছে, ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া সিমোন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং স্থানীয় হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিষয়টা খুবই ভয়াবহ খারাপ সংবাদ।
✦ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা – হসপিটাল, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, পাওয়ার প্লান্ট, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, ব্রীজ এমনভাবে ডিজাইন এবং নির্মাণ করতে হয় যাতে বড় ভূমিকম্পেও এগুলো সচল রাখা যায়।
🔴 ভেনেজুয়েলার এই জোড়া ভূমিকম্পটি প্রকৌশলীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, বিল্ডিং কোড কাগজে-কলমে যতই আধুনিক হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে তার কঠোর বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে যেকোনো বড় সিসমিক ইভেন্টে চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
©️
প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, পিইঞ্জ
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, বুয়েট, ঢাকা