23/06/2026
প্রসঙ্গ: সরকারি কাজে অনিয়ম – অভিযোগের নেপথ্যের কিছু বাস্তবতা।
----------------------------------------------------------------
এই লেখাটি হয়তো আমাদের নিজেদের বিপক্ষেই যাবে। তবুও লিখছি। কারণ, সরকারি নির্মাণকাজ নিয়ে এত অভিযোগ কেন ওঠে, তার কিছু বাস্তব কারণ সম্পর্কে আমাদের সবারই জানা উচিত।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। সরকারি নির্মাণকাজে বিভিন্ন দপ্তরের নিজস্ব রেট সিডিউল (Schedule of Rates) রয়েছে। যেমন—PWD, LGED, Roads and Highwaysসহ অন্যান্য সংস্থার আলাদা আলাদা রেট সিডিউল আছে। যদিও মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন, দেশের সকল সেক্টরে যেন একটি অভিন্ন রেট সিডিউল অনুসরণ করা যায়।
রেট সিডিউল বলতে মূলত কোনো কাজের একক মূল্য নির্ধারণকে বোঝায়। এই মূল্য নির্ধারণের সময় মালামালের দাম, শ্রমিকের মজুরি, ভ্যাট-ট্যাক্স, ঠিকাদারের ওভারহেড খরচ এবং যৌক্তিক মুনাফা বিবেচনায় নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ (Analysis) করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে একটি আরসিসি ঢালাই কাজের কথা ধরা যাক। এই কাজে সাধারণত রড, সিমেন্ট, বালি, পাথর এবং শ্রমিকের মজুরি লাগে। বর্তমান PWD রেট সিডিউল অনুযায়ী কিছু উপকরণের মূল্য ধরা হয়েছে—
- রড: ৮৭ টাকা/কেজি
- প্লাস্টার বালি: ১৯ টাকা/ঘনফুট
- সিলেট বালি: ৫৩ টাকা/ঘনফুট
- সিমেন্ট: ৫৫০ টাকা/ব্যাগ
- হেড মিস্ত্রি: ৭০০ টাকা/দিন
- হেলপার: ৫৫০ টাকা/দিন
এবার বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করা যাক।
বর্তমানে BSRM-এর মতো ভালো মানের রড কিনতে গেলে প্রতি কেজিতে ৯১ থেকে ৯৮ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের রড কিনলেও ৮৫ থেকে ৯০ টাকার নিচে পাওয়া কঠিন। ভালো মানের সিমেন্টের দাম ৬০০ টাকার ওপরে, আর মধ্যম মানের সিমেন্টও ৫৫০ টাকার বেশি।
সিলেট বালির বর্তমান বাজারদর প্রতি ঘনফুট ১৩৫ থেকে ১৫০ টাকা, যেখানে সিডিউলে ধরা হয়েছে মাত্র ৫৩ টাকা। প্লাস্টার বালির দামও ৩৫ থেকে ৫০ টাকা, অথচ সিডিউল রেট ১৯ টাকা। পাথরের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সিডিউলে প্রতি ঘনফুট পাথরের মূল্য ২১৯ টাকা ধরা হলেও ভালো মানের পাথর কিনতে ২৫০ টাকার বেশি ব্যয় হয়। ইটের দাম ধরা হয়েছে ১৩ টাকা প্রতি পিস, কিন্তু প্রথম শ্রেণির ভালো মানের ইট কিনতে ১৩ থেকে ১৪ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে।
শ্রমিকের মজুরির অবস্থাও একই রকম। বর্তমানে ৯০০-১০০০ টাকার নিচে একজন দক্ষ রডমিস্ত্রি/ রডমিস্ত্রি পাওয়া কঠিন। মোজাইক বা টাইলস মিস্ত্রিদের মজুরি আরও বেশি। অথচ সিডিউলে অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিকের মজুরি ধরা হয়েছে মাত্র ৭০০ টাকা। হেলপারদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বাস্তবে ৬০০ টাকার নিচে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হলেও সিডিউলে অনেক ক্ষেত্রে ৫০০-৫৫০ টাকা ধরা হয়েছে।
আমি এখানে মাত্র কয়েকটি আইটেমের উদাহরণ দিলাম। বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তব বাজারদর সিডিউল রেটের চেয়ে বেশি।
এখন প্রশ্ন হলো—যদি কোনো কাজের রেট ধরা হয় ১০০ টাকা, অথচ কাজটি সম্পন্ন করতে প্রকৃত ব্যয় হয় ১১০ টাকা, তাহলে ঠিকাদারের লাভ কোথায়? তার অফিস পরিচালনা, কর্মচারী বেতন, ব্যাংক গ্যারান্টি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবহন খরচ এবং বিভিন্ন চাঁদাসহ, অন্যান্য অলিখিত ব্যয়ই বা কোথা থেকে আসবে?
সমীকরণটা খুবই সহজ, কোনো ঠিকাদারই লোকসান দিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতে পারবেন না। তিনি লাভ করার চেষ্টা করবেনই। আর এর কারনেই মাঠ পর্যায়ের নানাবিধ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় মাঠপর্যায়ে কর্মরত প্রকৌশলী ও তদারককারী কর্মকর্তাদের।
এর মধ্যে একটু এদিক-সেদিক হলেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠেন। কাজ খারাপ হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন, সেই ক্ষেত্রে প্রকৌশলীগনের ও কোন উত্তর থাকেনা।
এজন্যই অনেক সময় প্রকৌশলীগন বলতে বাধ্য হন, আপনি আপনি জেনে-শুনেই কাজ নিয়েছেন, সুতরাং আপনাকে ড্রয়িং, ডিজাইন ও সিডিউল অনুযায়ী শতভাগ কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে। এরপর শুরু হয় ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর এক অদ্ভুত টানাপোড়েন, যা অনেকটা চোর-পুলিশ খেলার মতো।
আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রায়ই মনে করি, ঠিকাদারি মানেই অঢেল লাভ; দুই-একটি কাজ করেই অনেকে গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব ঠিকাদার লাভ করতে পারেন না। অনেকেই দেনার বোঝা টানতে টানতে শেষ পর্যন্ত পৈতৃক সম্পত্তি পর্যন্ত বিক্রি করে দেনা শোধ করেন।
আমার মা একটি কথা বলতেন—“অল্প সময়ে বড়লোক হতে গেলে হয় পরের ধন লাগে, নয়তো চোরের ধন লাগে।” হয়তো এ কারণেই ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ শোনা যায়—তারা শ্রমিকদের পাওনা টাকা মেরে দেয়। যদিও সবাই এক রকম নয়।
সবশেষে একটি কথাই বলতে চাই—আমরা সবাই শতভাগ মানসম্পন্ন কাজ চাই। রাষ্ট্র আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, আমি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে বদ্ধপরিকর। ঠিকাদার এতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটি আমাদের বিবেচনা করার কার্যত সুযোগ নেই; আমাদের কাজই হলো নির্ধারিত মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করা।
তবে মোবাইল সাংবাদিক ভাইদের উদ্দেশ্যে একটি অনুরোধ থাকবে। কোনো নির্মাণসাইটে গিয়ে মোবাইল ক্যামেরা হাতে দুই-চারটি কথা বলার আগে বিষয়টি একটু গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। আর যদি অনিয়মের বিরুদ্ধে বলতেই হয়, তাহলে সেটি যেন সত্য ও জনস্বার্থের জন্য হয়; ৫০০ বা ১০০০ টাকার বিনিময়ে থেমে যাওয়ার জন্য নয়।
আমরা সবাই দেশের মঙ্গল চাই। তবে দেশের মঙ্গল করতে গিয়ে যেন কোনো নির্দোষ মানুষের অমঙ্গল না হয়, সেই বিষয়টিও আমাদের মনে রাখা উচিত।