25/07/2026
বাংলাদেশে ভূমি জরিপ (সার্ভেয়ার) পেশাকে নিয়ন্ত্রণ ও মানোন্নয়নের প্রস্তাবনা
বাংলাদেশে বর্তমানে ভূমি জরিপ (সার্ভে) পেশায় সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাব রয়েছে। সার্ভেয়ার হওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিক মানদণ্ড এবং সরকারি লাইসেন্সিং ব্যবস্থা না থাকায় দেশে অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যথাযথ যোগ্যতা ছাড়াই সার্ভে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর ফলে জমি পরিমাপ, সীমানা নির্ধারণ এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমানে অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সরকারি অনুমোদন বা যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়াই সার্টিফিকেট প্রদান করছে। এতে প্রকৃত দক্ষ সার্ভেয়ার ও অদক্ষ ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, যারা এই ধরনের ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করছে বা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তাদের অনেকেরই সার্ভে কাজে বাস্তব মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা নেই। কেউ কেউ হয়তো এক-দুইটি ক্লাস করিয়ে বা সীমিত জ্ঞান দিয়ে সার্ভেয়ার তৈরি করছে, অথচ তারা নিজেরাই কখনো নিয়মিতভাবে জমি পরিমাপ বা মাঠ পর্যায়ের কাজ করেনি। ফলে একজন প্রকৃত সার্ভেয়ারের যে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা দরকার, তা এসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রতিফলিত হয় না।
এছাড়াও বর্তমানে ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা একটি লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। সঠিক নিয়মনীতি ও সরকারি তদারকির অভাবে কিছু অসাধু মহল এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সার্টিফিকেট বিক্রয় ও ভুয়া প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এর ফলে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে, জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করছে। এই পরিস্থিতি বন্ধে সরকারিভাবে একটি জাতীয় সার্ভেয়ার নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায়—
- সার্ভেয়ার হওয়ার জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- সরকারি পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান করতে হবে।
- নির্দিষ্ট সময় পরপর লাইসেন্স নবায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
- লাইসেন্সধারী সার্ভেয়ারদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় নিবন্ধন (Register) সংরক্ষণ করতে হবে।
- অনুমোদনহীন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও অবৈধ সার্টিফিকেট বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
একজন দক্ষ সার্ভেয়ারের বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি আইন, জরিপ পদ্ধতি ও প্রযুক্তিগত বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। যেমন—
- কোথায় ত্রিভুজ (Triangulation) পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে।
- কোথায় গড় (Average) পদ্ধতি বা অন্যান্য পরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
- ম্যাপের তুলনায় জমি বেশি বা কম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী কীভাবে সমাধান করতে হবে।
- অতিরিক্ত জমির প্রকৃত অধিকারী কে এবং কোন অবস্থায় কার দখল থেকে সমন্বয় করা আইনসম্মত।
- মাঝখানে স্থায়ী স্থাপনা থাকলে সীমানা সমন্বয় বা স্থানান্তরের আইনগত সীমাবদ্ধতা কী।
এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে দেশে অসংখ্য বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।
অতএব, সমগ্র বাংলাদেশে সার্ভেয়ার পেশাকে একটি জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে এনে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, প্রশিক্ষণ, তদারকি এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে ভূমি পরিমাপের মান উন্নত হবে, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।