20/04/2023
ক্যাশ ফ্লো বা নগদ প্রবাহ এড়াতে যা করবেন
যেকোনো ব্যবসার আর্থিক সক্ষমতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার বড় একটি লক্ষণ হলো বিজনেসের নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লো। নগদ অর্থ প্রবেশের চেয়ে বের হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় নগদ প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়।
খরচ হওয়া টাকার পরিমাণ যখন বিজনেসের আয় থেকে বেশি হয়, তখনই ক্যাশ ফ্লো এর সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে লিক্যুইডিটির অভাব বা তারল্য ঝুঁকি দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পরিমাণে নগদ টাকা না থাকা বা মাত্রাতিরিক্ত নগদ টাকা থাকার সমস্যা হচ্ছে তারল্য ঝুঁকির সমস্যা।
নগদ টাকা কম থাকলে কোম্পানি সাপ্লায়ারদের টাকা দিতে পারে না, সময়মতো বিল পরিশোধ করতে পারে না। এর ফলে বিজনেস চালাতে নানারকম সমস্যার সম্মুখীন হয়।
আমরা অনেকে ভাবি ক্যাশ ফ্লো-এর সমস্যা শুধু বড় ব্যবসার ক্ষেত্রে ঘটে। কিন্তু না, ক্যাশ ফ্লো সমস্যায় একটি স্মল বিজনেসও পড়তে পারে। তাতে করে আপনার লাভ কমে যেতে পারে, স্টকে বিক্রি হচ্ছে না এমন প্রডাক্টের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে।
স্মল বিজনেসের এই যুগে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি কী করতে পারেন এমন পরিস্থিতিতে?
ক্যাশ ফ্লো সমস্যার সবচেয়ে বড় কারণগুলির মধ্যে আছে ব্যয়ের দিকে নজর না দেয়া, ভবিষ্যতের ক্যাশ ফ্লো সম্পর্কে অনিশ্চয়তা, ধীরগতিতে পণ্যের দাম পরিশোধ করা, প্রডাক্ট নিয়ে পরিকল্পনা না থাকা ইত্যাদি।
ক্যাশ ফ্লো বাড়াতে চাইলে, এই কৌশলগুলিকে কাজে লাগাতে পারেন:
# মাসিক ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট তৈরি করুন
আমরা অনেকেই বার্ষিক ক্যাশ ফ্লো তৈরি করার কথা জানি। তবে বিজনেসের স্বচ্ছতা বাড়াতে মাসিক ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট বানাতে পারেন। নিয়মিত ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট বানালে নিজের মাসিক বাজেটে অনেক সূক্ষ্ম বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
মাসিক ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট এর মাধ্যমে সেলসের ওঠানামা ও বিজনেসের অর্থনৈতিক নানা বিষয় চিহ্নিত করে এর সমাধান করা যায়।
# যত দ্রুত সম্ভব চালান নিন
এটা নির্ভর করছে আপনার বিজনেস কী ধরনের সার্ভিস দেয় দার ওপর। অনেক সেবা বা পণ্য আছে যেটা কিস্তিতে পরিশোধ করার সুবিধা থাকে। আবার এর বাইরেও দেরি করে পরিশোধ করার সুবিধা অনেক বিজনেসই দিয়ে থাকে। কিন্তু এভাবে যদি পরিশোধ না হওয়া পেমেন্ট জমতে থাকে, আপনার ক্যাশ ফ্লো ঠিক থাকবে না।
কাস্টমারদের চালান পরিশোধ করার জন্য একটি নির্দিষ্ঠ সময় উল্লেখ করে দিন। একই সঙ্গে এমন বিল যেন বেশি আটকে না থাকে তা নিশ্চিত করুন।
# ব্যয় কমান
মাসিক বাজেট বানালে আপনি কোথায় অপ্রয়োজনীয় খরচ করছেন তা সহজেই চিহ্নিত করতে পারবেন। এই অপ্রয়োজনীয় খরচগুলি বাদ দেয়ার চেষ্টা করুন।
স্টকের পণ্য শেষ হতে যদি সময় লাগছে তাহলে তার আগেই কেন বাড়তি পণ্য আপনি অর্ডার করছেন ভাবুন। মার্কেট সবসময় আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এর গতি ও কখন কোন বিষয়টি মানুষ পছন্দ করছে সেইদিকে চোখ রাখুন। সেই অনুসারে পণ্য স্টক করুন।
# পণ্যের মূল্য বাড়ান
অনেক বিজনেস পণ্যের দাম বাড়াতে চায় না। তারা ভয় পায় যে পণ্যের দাম বাড়ালে কাস্টমারদের ধরে রাখা যাবে না। তবে, বাজারে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে নিজের পণ্যের দামের তুলনা করে দেখুন, আপনি সস্তায় পণ্য বিক্রি করছেন কি না।
কোন পণ্যগুলির ক্ষেত্রে কাস্টমাররা বেশি দাম দিয়ে হলেও ভাল মানের পণ্য কিনতে চাইবে আর কোথায় সাশ্রয় করতে চাইবে সেটা বুঝতে হবে।
ধরুন, আপনি একটা রেস্টুরেন্ট চালান। ফাইন ডাইনিং অভিজ্ঞতার জন্য যার অনেক সুখ্যাতি আছে অথবা এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত বিউটি সেলুনটি আপনার। আপনি যদি পণ্য বা সেবার ১০-১৫% দাম বাড়ান, তাহলে কাস্টমারদের আপনাকে এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কতটুকু?
# প্রফিট মার্জিন বাড়ান
পণ্য কিনতে আপনি কত টাকা খরচ করছেন তা আপনার বিজনেসে প্রফিট বা লাভের পরিমাণের ওপর ভূমিকা রাখে। পণ্য কেনায় অতিরিক্ত খরচ করলে আপনার বিজনেসের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। বাজারে আপনার পণ্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী খরচে কোথা থেকে কিনতে পারবেন তার খোঁজ নিন, সাপ্লায়ারদের সাথে দরদাম করে পণ্য কিনুন। আপনার ব্যবসা বড় হলে কিন্তু তারাও লাভবান হবে। তাই তারা আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারবে তা জিজ্ঞেস করুন।
# পণ্য বিক্রির সময় সৃজনশীল হন
কোন সময় আপনার পণ্য বিক্রি কমে যেতে পারে তা আগে থেকেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করুন ও পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে নানারকম সৃজনশীল কৌশল অবলম্বন করুন। তাহলে ক্যাশ ফ্লো সংক্রান্ত সমস্যা এড়ানো সহজ হবে।
কাস্টমারদের সাথে সরাসরি কথা বলে পণ্যের বিক্রি বাড়ানো যায় কিনা দেখতে পারেন।
# ভাল স্টকিং প্রোগ্রাম রাখুন
আপনার বিজনেসের মূলে যদি থাকে পণ্য বিক্রি করা, তাহলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্টক রাখলে ক্যাশ ফ্লো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সেলস প্রতিনিধিরা সবসময় চায় আপনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনুন, কিন্তু তাদের লোভনীয় অফারের পাশাপাশি বাস্তবতার দিকেও মনোযোগ দিন। পর্যাপ্ত পণ্য বিক্রি করতে না পারলে কম দামে স্টক বাড়ানোর তেমন কোনো সুবিধা নেই।
ভাল ভাবে স্টক ম্যানেজ করতে একটি ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে বিনিয়োগ করতে পারেন।
তাহলে কোন পণ্যগুলির চাহিদা বেশি, আপনার বিক্রির ধরন ও পণ্য কেনার কার্যকর প্যাটার্ন চিনিয়ে দিতে পারবে।
# ই-কমার্স
অনেক দোকানে কার্ডের মাধ্যমে বিল দেয়া যায় না। ফলে ক্রেতাদের ঘুরে ঘুরে একটি এটিএম খুঁজে বের করে টাকা আনতে হয়। তাই, অনলাইনে খুব একটা পণ্য বিক্রি না করলেও ওয়েবসাইটে ট্রানজেকশনের অপশন রাখুন।
পেমেন্ট করার অন্যান্য অপশনও সহজ রাখুন। সেটা অনলাইনে হোক, ওয়েবসাইটে হোক বা ফিজিকাল শপে। ক্রেতারা যাতে তাদের সুবিধা অনুযায়ী পেমেন্ট করতে পারে। তাহলে পরবর্তীতে তারা আপনার বিজনেসের সেবা নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।