11/05/2014
[[[প্রতিদিন একটি বৃক্ষ ]]]
রিকশা চালিয়ে দিনযাপন করেন ফরিদপুর শহরতলির
ভাজনডাঙ্গা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব সামাদ শেখ। অভাবের সংসারে নুন
আনতে পান্তা ফুরায়। তবু তার গাছ লাগানোর ইচ্ছা ফুরায় না।
রিকশা চালিয়ে রোজ যা রোজগার করেন সেখান থেকে প্রথমেই
গাছের চারা কেনেন। যেখানেই গাছ লাগানোর উপযোগী একটু
ফাঁকা জায়গা পান সেখানেই চারাটি রোপণ করে দেন। ২৫ বছর ধরে এভাবেই প্রতিদিন একটি গাছ লাগিয়ে আসছেন সামাদ শেখ।
গাছপাগল সামাদ শেখকে নিয়ে প্রচ্ছদ লিখেছেন হাসকালে ঘুম থেকে উঠেই নিজের রিকশাটি নিয়ে রুটি-রুজির কাজে নামেন
ফরিদপুর শহরতলির ভাজনডাঙ্গা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব সামাদ শেখ। এক-দেড়শ' টাকা পকেটে আসার পর নাশতা সেরেই তার প্রথম কাজ গাছের চারা কেনা। একটি গাছও না লাগিয়ে রাতে বাড়ি ফিরেছেন_ এমন ঘটনা গত ২৫ বছরে ঘটেনি তার জীবনে। প্রতিদিনের আয়ের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেন চারা কেনা, রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে। সেই সামাদ শেখের ঘরে অভাব- অনটন দু'যুগের নিত্যসঙ্গী। এলাকায় 'পাগলা সামাদ' নামে পরিচিত এই ব্যতিক্রমী মানুষটিকে সবাই ভালো জেনে প্রশংসা করলেও স্ত্রী, দুই ছেলে আর পুত্রবধূর সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বড় ছেলে কুতুবউদ্দিন রঙমিস্ত্রির কাজ করে। ছোট ছেলে চপল ডিসি অফিসে আর্দালির কাজ করে চুক্তিভিত্তিতে। সামাদের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম তার গাছপাগল স্বামীকে নিয়ে গর্বও যেমন করেন, পাশাপাশি সংসারের দৈন্যদশা নিয়ে রয়েছে গভীর হতাশা আর ক্ষোভ।
খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে রিকশা চালাতে বের হন সামাদ। মোবাইল নেই, তাই তাকে সহজে পাওয়া যায় না। এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির থাকার লোক নন তিনি। মাথার মধ্যে সব সময় একটা বিষয়ই ঘোরে_ রাস্তার পাশে, খাস জমিতে, কবরস্থানে, শ্মশানে, নদীর পাড়ে বা পুকুরের ধারে কোথাও যদি গাছ লাগানোর একটুখানি জায়গা পাওয়া যায়। জায়গা পছন্দ হলেই তিনি ছুটে যান নার্সারিতে।
ফলের চারার মধ্যে তার বেশি পছন্দ কাঁঠাল গাছ। আম, জাম, জামরুল,আমলকী, নারকেল চারাও লাগান সামাদ। গত ২৫ বছরে শুধু ফরিদপুর সদর নয়, পার্শ্ববর্তী চরভদ্রাসন, সদরপুর, মধুখালী, এমনকি রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য বৃক্ষরোপণ করেছেন তিনি। আমৃত্যু এভাবে গাছ লাগিয়ে যেতে চান সামাদ। গাছের প্রতি তার তীব্র ভালোবাসা। ছায়া আর অক্সিজেন দিয়ে সমৃদ্ধ করে চলেছেন গোটা অঞ্চলকে।
শুধু ফলদ আর বনজ গাছই নয়, মাঝে মধ্যে ঔষধি গাছের চারাও রোপণ করেন সামাদ। গদাধরডাঙ্গি, সাদীপুর, ভাজনডাঙ্গা, হাজীগঞ্জের মানুষের প্রিয়মুখ সামাদের এই ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টায় ফরিদপুর চরভদ্রাসন সড়কের পাশে এখন ছায়াহীন কোনো ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। বন বিভাগের গাছের সঙ্গে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে তার রোপিত বৃক্ষগুলো মনে করিয়ে দেয়_ সব পাগলামি খারাপ নয়।
তার স্ত্রী ঝর্ণা বেগমের বয়স ৫০-এর কোঠায়। এক সময় মাটি কেটে রোজগার করে দুই ছেলেকে বড় করেছেন। এখন পরিশ্রম করার মতো শক্তি নেই। ছেলেরা যৎসামান্য আয় করে মাকে দু'বেলা খাবার দেয়। তবে ঝর্ণার অভিযোগ, স্বামীর কোনো খেয়াল নেই তার দিকে। মাথার শুকনো চুল বের করে দেখিয়ে বললেন, 'একটু ত্যাল কিনতে কইছি তিন-চার দিন আগে। সে আইজও পাঁচটা কাঁঠালের চারা কিনছে, কিন্তু ত্যাল আনে নাই।' অভিযোগ স্বীকার করে সামাদ বলেন, 'আমি বাড়ির ছাগলের জন্য দুই কেজি কুঁড়া আর আমাগো খাবারের জন্য দুই কেজি চাইল কিনি প্রতিদিন। বাকি টাকায় গাছের চারা কিনতে হয়। এই রোইদের মধ্যে রিকশা চালানো ভারি কষ্টের কাম। রাস্তায় লোকজন নাই। তাই কামাই-রুজি কম। ত্যাল-সাবান কিনার টাকা পামু কই ?'
অভাবী হলেও ধারদেনা করার অভ্যাস নেই সদাহাস্য সামাদের। টাকা না থাকলে কিছু বাকিতে কেনার পরই রিকশা চালিয়ে টাকা আয় করে জানালা বা দোকানের ঝাপের ফাঁক দিয়ে রেখে যান। নার্সারি থেকে চারা কিনেও একইভাবে গেটের ভেতর টাকা ফেলে রেখে যান। এসব টাকা দেখে সবাই বোঝে এটা সামাদের কাজ। সামাদ শেখ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান তার লাগানো গাছ কেউ তুলে ফেললে বা কেটে বিক্রি করলে। তার লাগানো গাছের ফল স্থানীয়রা যখন খায় বা আগ্রহ করে তার বাড়িতে পাঠায় তখন নিজেকে সার্থক মনে হয় সামাদের।
ভাজনডাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানালেন, ১০ টাকা থেকে ৪০ টাকা দামের বিভিন্ন গাছের চারা প্রতিদিনই কিনে নিয়ে যান সামাদ। কোনো বাকি নেই তার। স্থানীয় বাসিন্দারা তার লাগানো গাছের যত্ন নেয়। বৃষ্টি নামলে মাথা ঠিক থাকে না সামাদের। তখন গাছ লাগানোর ঝোঁক আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক হোসেন জানান, প্রতিদিন গাছ লাগিয়ে আনন্দ পান সামাদ শেখ। একজন রিকশাচালক হলেও তার এই কাজ সমাজের অনেক সচেতন মানুষের কাজের চেয়েও মূল্যবান। সামাদ সমাজের একজন অনুকরণীয় ব্যক্তি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরিবেশবিদ প্রফেসর আলতাফ হোসেনের অভিমত, একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ একটি ভালো কাজ করছেন, তাকে আমরা বলছি পাগল। আমার কাছে মনে হয়, সামাদের চেয়ে সুস্থ মানুষ সমাজে কম রয়েছে বলেই তাকে আমাদের পাগল মনে হয়।