11/08/2026
খাগড়াছড়ি'র নির্মাণাধীন ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির'র স্থাপত্য নকশার অসংগতি সম্পর্কে একজন সচেতন ভক্তপ্রাণ হিসেবে আমার মতামত-
এই বক্তব্য কোনো ধর্ম, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; বরং ধর্মীয় স্থাপত্যের নান্দনিকতা, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থে অত্র এলাকার একজন ভক্তপ্রাণ বাসিন্দা হিসেবে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে উপস্থাপন করছি।
...................................................................................................................................
খাগড়াছড়ি লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরের প্রকাশিত নকশা ও নির্মাণসংক্রান্ত দৃশ্যাবলী পর্যবেক্ষণ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
আমি বিশ্বাস করি, একটি মন্দির কেবল একটি ভবন নয়। এটি একটি এলাকার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং স্থাপত্যিক ঐতিহ্য এবং অত্র এলাকার বাসিন্দাদের রুচিবোধের প্রতীক। যা দশকের পর দশক এমনকি কয়েক শতক ধরেও ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে যায়। এই স্থাপনাগুলোই কয়েক শতক পরে গিয়েও কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের রুচিবোধ, আচার, ব্যবহার, চিন্তা-ধারাকে প্রকাশ করে। তাই এ ধরণের নকশা প্রণয়নে যথাযথ অনুপাত, কার্যকর Space Planning, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং ঐতিহ্যগত উপাদানের সমন্বয় অপরিহার্য।
লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির'র প্রকাশিত নকশা সম্পর্কে আমার প্রযুক্তিগত উদ্বেগগুলো হলো—
• সামগ্রিক Massing ও Volume Composition এ পর্যাপ্ত ভারসাম্য আছে কি না, তা যাচাই করা যথেষ্ট প্রয়োজন।
• গর্ভগৃহ, মণ্ডপ, Entrance Axis এবং অন্যান্য প্রধান স্থানের মধ্যে পরিকল্পিত স্থানিক শ্রেণিবিন্যাস (Spatial Hierarchy) স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
• Elevation-এ ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদানের Proportion, Scale এবং Visual Balance ধর্মীয় স্থাপত্যের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
• কাঠামোগত নকশা, ভিত্তি, Load-Path, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং প্রযোজ্য Building Code অনুসরণের বিষয়গুলো নিবন্ধিত প্রকৌশলীদের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
• ভক্তদের নিরাপদ চলাচল, পর্যাপ্ত সমাগমের স্থান, প্রবেশ ও নির্গমন ব্যবস্থা, বায়ু চলাচল এবং প্রাকৃতিক আলোর মতো কার্যকর নকশাগত বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্থাপত্য বিদ্যায় ক্ষুদ্রজ্ঞানের আলোকে আমি মনে করি, মন্দিরের নকশা প্রণয়নের সময় অন্তত নিম্নোক্ত স্থাপত্যগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
এগুলো কোনো বাধ্যতামূলক কোড নয়; বরং পরিকল্পনার প্রাথমিক রেফারেন্স।
★গর্ভগৃহ ন্যূনতম ৮'×৮' থেকে ১২'×১২' (দেবমূর্তির আকার অনুযায়ী)
★অন্তরাল প্রায় ৪'–৬' গভীর
★নাটমণ্ডপ / প্রার্থনা হল ন্যূনতম ২০'×২০'; বড় মন্দিরে ৩০'×৪০' বা তার বেশি
★প্রদক্ষিণ পথ ন্যূনতম ৪'–৬' প্রশস্ত
★প্রধান প্রবেশদ্বার ৫'–৮' প্রশস্ত, ৮’-১০’ উচ্চতাবিশিষ্ট
★সিঁড়ি ন্যূনতম ৫'–৬' প্রশস্ত; রাইজার ৬"–৬.৫", ট্রেড ১১"–১২"
★শিখর / টাওয়ার গর্ভগৃহের প্রস্থের আনুমানিক ২.৫–৩.৫ গুণ উচ্চতা
★ছাদের অভ্যন্তরীণ উচ্চতা ১২'–১৮' (প্রয়োজনে আরও বেশি)
★পরিধি ঘোরার খোলা স্থান ন্যূনতম ৮'–১০'
★বারান্দা / প্রবেশ প্ল্যাটফর্ম ৬'–১০' গভীর
উল্লেখ্য: উপরোক্ত মাপসমূহ কেবলমাত্র প্রাথমিক স্থাপত্যগত Reference. চূড়ান্ত নকশা অবশ্যই প্রকল্পভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। তা অবশ্যই মন্দির কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, Site এর অবস্থা এবং নিবন্ধিত স্থপতি ও প্রকৌশলীদের পেশাগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
এমতাবস্থায় আমার বিনীত আহ্বান-
খাগড়াছড়ির লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির যেন শুধু একটি নির্মিত ভবন না হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক নিদর্শনে পরিণত হয়। এবং আমরা যেন এমন একটি স্থাপনা রেখে যেতে পারি, যা কয়েক দশক বা কয়েক শতক পরেও মানুষ গর্বের সঙ্গে দেখবে এবং বলবে-
-“এটি আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের স্থাপত্যবোধের একটি সুন্দর প্রতিচ্ছবি”
সুতরাং, যদি প্রকল্পটি এখনও আলোচনাধীন থাকে, তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে একটি স্বাধীন Design Reviewing Process পরিচালনা করা হোক, যেখানে নিবন্ধিত স্থপতি, প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিনিধিরা একসঙ্গে নকশাটি পর্যালোচনা করবেন। প্রয়োজনে গঠনমূলক সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটিকে আরও নান্দনিক, নিরাপদ এবং ঐতিহ্যসম্মত করে তোলা সম্ভব।
পুনশ্চঃ আমার লক্ষ্য প্রতিবাদ কিংবা সমালোচনা নয়;বরং উন্নত স্থাপত্যচর্চা।