08/06/2026
আষাঢ় মাসে যখন তখন বৃষ্টি নামে। কিন্তু মাঝে মধ্যে বিকেলে পশ্চিম আকাশ জুড়ে হলদে আলোর খেলা দেখা যায়। হলদে আলো আকাশ জুড়ে যে আবরণ সৃষ্টি করে, তা পুরো শহর গ্রামকে সোনালি আভায় মুড়ে দেয়।
আহিরা চট্টগ্রাম শহরে থাকে। সেখানে আহির বাবা মি.আরসের রয়েছে নিজস্ব জমি। তাতেই তৈরি করেছে শখের দো'তালা ডুপ্লেক্স বাড়ি। আরসের ডুপ্লেক্স বাড়ির উপরও সোনালি আলো তার কারুকার্য দেখাতে কৃপণতা করেনি।
আহি রুম থেকে বেরিয়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশ সুন্দর পরিবেশ। তবে কোলাহল নেই। একেবারেই যেন থম মারা।
হঠাৎ মহুয়া নিজের ঘর থেকে আহির ঘরে ছুটে এসেছে।
আহি আজকাল আর আগের মতো নেই। কিছু একটা হয়েছে মেয়েটার। মেয়েটা খুব শান্তশিষ্ট হলেও মহুয়ার সাথে প্রাণ ভরে গল্প করতো। ইসরা এলে আড্ডা দিতো।
তবে মহুয়া আহিকে আজকাল আগের মতো সময় দিতে পারে না। স্কুলের পরীক্ষার কাজে একটু ব্যস্ত।
আর ইসরা? সে তো বিয়ে করেছে পালিয়ে।
এই তো বসন্তের শেষ দিকে তুষার নিজের মনের কথা জানায় ইসরাকে। সম্মতি দেয় ইসরা। কিন্তু বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ আসায় ইসরা আর তুষার সিদ্ধান্ত নেয় তারা পালাবে। আহিকে জানায়।
আহি সাহায্য করতে পারেনি। কারণ বাড়ি থেকে তার নিজেরই বেরোবার অনুমতি থাকে না।
তাই ইসরা একটু ভুলও বুঝে আহিকে। পালিয়ে গিয়ে সংসার পেতেছে, কিন্তু আহিকে জানালোও না কেমন আছে।
তাই এসব নিয়েও আহি একটু হতাশায় ভুগে।
মহুয়া পাশ ঘেঁসে দাঁড়ালে আহি একটু নড়েচড়ে দাঁড়ায়।
“আপু। কখন এলে?”
“এইতো। মন খারাপ?”
আহি মাথা নিচু করে উত্তর দেয়, “না।”
“আমার কাছে লুকোবি?”
এবার আহি একটু কান্না জড়ো করে বলে,
“ইসরার সাথে যোগাযোগ বন্ধ আজ প্রায় তিনমাস। তুমি তো জানো, ওকে আমি কতটা ভালোবাসি। মানছি আমি সাহায্য করতে পারিনি। তাই বলে এতোদিন অভিমান করে থাকবে?”
আরো কথা বলবে, তখনই অনুভব করলো পেছন থেকে কেউ আদরে ভাবে জড়িয়ে ধরেছে।
আহি বুঝলো এটা পরিচিত ছোঁয়া। কি অদ্ভুত! প্রিয় মানুষগুলোর ছোঁয়াও বুঝি এভাবে মনে রাখা যায়!
আহির চোখের কোণে জল জমে গেছে। ছলছল চোখেই পেছনে তাকালো।
তাকিয়ে আগাগোড়া পরখ করে জড়িয়ে ধরলো ইসরাকে।
ইসরাও বাহুদ্বয়ে আপন করে নিলো প্রিয় সখিকে।
অভিমানের সুরে বললো, “আমাকে একটু মনেও পড়লো না তোর?”
“তুই আমার কলিজার টুকরো। তোকে ভুলি কি করে?”
“তাহলে এতোদিন কোনো যোগাযোগ করিসনি কেন?”
এবার পাশ কাটিয়ে মহুয়া বললো,
"যাহ বাবা! বান্ধবীকে পেতেই আপু পর? মানে আমি যে এখানে দাঁড়িয়ে, কারো খেয়ালই নেই।”
আহি একটু হেসে ইসরা আর মহুয়ার সাথে ঘরে এলো।
সেদিন কি হয়েছিল, কেন যোগাযোগ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল—সব ইসরা একে একে আহিকে বললো।
এবার ড্রয়িং রুম থেকে আওয়াজ এলো তুষারের।
তুষার এখনো পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি চারটা টিউশন করায়। এতে ইসরা-তুষারের সংসার কোনোমতে চলে।
ইসরাও পড়ায়, তবে এখন কিছুটা অসুস্থ। তাই তুষার সব বন্ধ করতে বলেছে। অবশ্য সুস্থ হলে আবার শুরু করবে।
ইসরার মা-বাবা এখনো তাদের মানেনি। তবে তুষারের মা তাদের গোপনে সাহায্য করে। কি করবে, নিজের ছেলে তো। বাবা জানলে হয়তো সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে।
এসব কথা আহি জানার পর একটু আক্ষেপ করে।
সবাই আহির ঘরের বিছানায় বসে আড্ডা দিচ্ছিলো।
আহির মা নুর বেগম এসে সবাইকে চা আর কুকিজ দিয়ে গেলো।
আজ রাতের ডিনার এখানেই—এই বলে হুশিয়ারিও দিয়ে গেলেন।
আহি বন্ধুদের পেয়ে খুবই খুশি হলো। আর মহুয়া তো মনে প্রাণে এই খুশিই ধরে রাখতে চায়।
তবে গতকালের ঘটনাটাও এখনো মনে চেপে রেখেছে। কাউকে বলতে হবে।
সব কথা বলার জন্য তার বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে আছে নীবরাজ আর বোন আহি।
আহিকে এখন এসব বলা উচিৎ হবে না। নীবরাজকে বলে মতামত নিতে হবে।
কিন্তু সকালে মেসেজ করেছে, এখনো সিন করেনি।
তাই মন থেকে কথা গুলো পুরোপুরি সরাতেও পারছে না।
অন্যদিকে, খান বাড়ির ছোট ছেলে আসছে—সেই খুশিতে আজ খান বাড়ি সুসজ্জিত।
নাহার বেগম রান্না করছে ছেলের সব পছন্দের খাবার।
আর অনিরাজ ঘর সাজাচ্ছে। যদিও ডাক্তার মানুষ এসবে পটু না।
তবে আজ নীবরাজ খুশি হলেই মা'কে মহুয়ার কথা বলবে। তাই এতো আয়োজন।
সন্ধ্যার পর নীবরাজ ঘরে ফিরে।
প্রাণ প্রিয় ছেলেকে এতোদিন পর দেখে আদরে বক্ষদেশে জড়িয়ে নেয় নাহার।
“কেমন আছিস বাবা?”
নাহার সুলতানা কাঁদো কাঁদো গলায় সুধায় নীবরাজকে।
নীবরাজ নির্বিকার কণ্ঠে বলে, “ভালো।”
কথাটা যেন ছোট অস্ত্রের মতো বিঁধে। অনিরাজ পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো।
ভাইকে এমন অবস্থায় দেখে আর চুপ থাকতে পারে না সে। বলে ওঠে!
“সেদিন বলেছিলি তোর আমাদের উদ্দেশ্য ছেড়ে পড়ানোর শখ জেগেছে। চলেও গেলি। সরকারি চাকরিতে কী মোয়া পেলি যে আমাদের উদ্দেশ্য কেন এই শহরে আসা সব ভুলে গিয়ে একা থাকাটাকে বরণ করলি?"
নীবরাজ কোনো কথা বললো না।
অনিরাজ আবারও বলে গেলো।
"চুপ করে আছিস কেন? ভুলে যাস না, তুই খান বাড়ির ছেলে। খান বাড়িতে তোর-আমার একটা বড় উদ্দেশ্য হাসিল এখনো বাকি। এর আগেই এমন সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলি? জিজ্ঞেস করিনি। তবে আজ আমি একটা বিষয় পরিষ্কার করে জানান দিচ্ছি— তুই আবার পুরোনো নীবরাজ হবি। তোর কী হয়েছে, কেন এমন করেছিস, আমি কোনো কৈফিয়ত নিবো না। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য ভুললে চলবে না ভাই। তুই সেদিন হারামির বংশধরকেও ছেড়ে দিয়েছিলি।”
নীবরাজ এতোক্ষণ সব শুনেছে। “হারামির বংশধর” কথাটায় যেন তার রগ ছিঁড়ে গেলো। হুংকারের মতো বলে উঠলো,
“আম্মা, তোমার বড় ছেলেকে চুপ করতে বলো। নইলে যাকে হারামি বললো, তার ঘরেই পুঁতে রেখে আসবো।”
কথাটা শুনে অনিরাজ একটু ইতস্তত হলো। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো। আর মনে মনে আওড়ালো, “ভাইকে এখন এসব বলা উচিত হয়নি।
মাঝখানে মহুয়ার কথাটা বলতে পারবে না।” পরক্ষণে আবারও বললো, “আয় ঘরে আয়।”
নীবরাজ ঘরে প্রবেশ করে সোজা নিজের ঘরে চলে গেলো। ঘরের প্রতিটা জিনিস এখনো সুন্দর সাজানো। একটুও ধুলো জমেনি। মা নাহার সুলতানা সব সময় এগুলো পরিষ্কার করে রাখে। ছেলেকে মনে পড়লে ছেলের ঘরে এসে পড়ে থাকে। নীবরাজ ঘরের আশেপাশে চোখ বুলালো। বেডের পাশে ডেস্কের উপর এখনো দুল জোড়া পড়ে আছে।
ভেইসের পাশে রাখা, খেয়াল পড়ে না। বেলকনির রেলিং-এর ধারে ডজন খানেক ফুলদানি, ঘরের চারিদিকে নানারকম ইনডোর প্ল্যান্ট সাজানো। আলমারির পাশের ডেস্কে হাতের রোলেক্স ঘড়িটা রেখে সোজা ওয়াশরুম চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে বের হয়। তার ঘরে কেউ আসে না সচরাচর। তাই নিশ্চিন্তেই এসেছিল। কিন্তু এসেই হকচকিয়ে গেলো।
কারণ রুমে জুসের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে ছিল অপরূপ সুন্দরী হৃধি।
হৃধি—পুরো নাম হৃধিকা, নীবরাজের খালাতো বোন। নাহার সুলতানার বেশ আদরের হৃদি৷ এখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ার এ পড়ে অর্থনীতি ডিপার্টমেন্ট এ। নাহার সুলতানা মনে স্বপ্ন দেখে হৃধিকে ঘরের ছোট বউ করে আনবে। নিজের মেয়ের বেলায় তার বয়স মোটেও চোখে পড়েনা।বরং মহুয়ার বয়স নিয়েই তার যত ঝামেলা।
হৃধিরকে মাঝে মাঝে বউমা বলে ডাকে নাহার সুলতানা অন্যদিকে হৃধিও নীবরাজকে ছোট থেকে পছন্দ করে।করবে না-ই বা কেন? ছেলেটা কত ভদ্র আবার পড়াশোনায় ভালো দারুণ ফিটনেস আবার গায়ের রঙ তো দুধে-আলতা। এই ছেলেকে দেখলেই প্রেমে পড়ার মতো। আবার হৃধিও তো কম সুন্দরী নয়। যেমন গাঁয়ের রঙ তেমনি লম্বা পাঁচফিট তিন ইঞ্চি হাইট পুরো হলিউড নায়িকাদের মতো ফিটনেস। আবার ঠোঁটের নিচে কালো তিল।
কিন্তু নীবরাজের কী এসবে খেয়াল আছে? সে তো এক উজ্জ্বল শ্যামবর্ণার প্রেমে অন্ধ। নীবরাজ হৃধিকে দেখেই তাড়াহুড়ো করে ব্যাডে রাখা ব্রাউন রঙের টি-শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে পুনরায় ওয়াশরুমে ছুট লাগায়। টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে আবার রুমে আসলে দেখে তখনও হৃধি দাঁড়িয়ে আছে।
“এই মেয়ে, কারো ঘরে এলে নক করতে পারিস না?”
হৃধি নির্লজ্জের মতো হেসে জবাব দিলো,
“নিজের ঘরে আসতে পারমিশন লাগে নাকি?”
এবার নীবরাজ একটু ঢং করেই বলে, “কার ঘর?”
হৃধি জবাব দেয়, “কেন, তোমার আর আমার! আচ্ছা শোনো এখন তো চলেই এলে। আমাদের বিয়ে কিন্তু পাকা বুঝলে??
আর বিয়ের পর এসব জঙ্গল ঘরে রাখা চলবে না। এসব আমার একদম পছন্দ না।”
এবার নীবরাজ একটু কনফিডেন্স নিয়ে বলে, “শখ কত মেয়ে! যখন আমার বউ আসবে না? তোকে তুলে আছাড় দিবে। দেখিস, এসব কথা আর ভুলেও বলিস না।”
হৃধি হেসে বললো, “আমিই হবো।”
“কী হবি? আমার বউয়ের হেল্পিং হ্যান্ড?”
এমন অপমান হৃধির মোটেও সহ্য হয় না। জুসের গ্লাসটা এক ঝটকায় নীবরাজের হাতে দিয়ে নিচে খালাম্মার কাছে চলে যায়। খালাম্মা তার একমাত্র ভরসা এই বাড়িতে। অনিরাজ একটু রাগী বলে তার ধারে কাছেও ঘেঁষে না। নীবরাজও তাকে অপমান করলো তাই নালিশ জানাতে খালাম্মাই বেস্ট অপশন।
#পর্ব-০৮
#অনিশ্চিত_গন্তব্য
#লেখিকা_সুমাইয়া_সুলতানা_আইমি
(বি:দ্র: সামনে পরীক্ষা তার কারণে নতুন পর্ব দেওয়ায় দেরি হয়। আগামী ২ জুলাই থেকে পরীক্ষা তাই পরীক্ষার আগে এটাই লাস্ট। পরবর্তী নতুন পর্ব পরীক্ষার পর দেওয়া হবে।)